
নিজস্ব সংবাদদাতাঃ
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দায়িত্বপালন শেষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার শূন্য থেকে নয় “মাইনাস থেকে” যাত্রা শুরু করেছিল। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে সংস্কারের পথে এগিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সরকার বিদায় নিলেও গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা ও অধিকারচর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায়- এই আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের একদিন আগে সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, “নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র হিসেবে পরিস্ফুটিত করতে হবে।” তিনি উল্লেখ করেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। সেই স্বপ্ন ও শক্তি ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।”
গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতি যেন কখনো ভুলে না যায়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তাদের ত্যাগের কথা স্মরণ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি জানান, পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে “জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে। জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলে দেশ-বিদেশে থাকা সবাইকে সপরিবারে পরিদর্শনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অঙ্গীকার তুলে ধরে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে “পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫” প্রণয়ন করা হয়েছে। এখন আর বেআইনি গুম, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ভয়ের সংস্কৃতি নেই বলে দাবি করেন তিনি।
বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয়, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি-ফৌজদারি আইনে সংস্কারের কথা তুলে ধরেন তিনি।
অর্থনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং অর্থপাচার ছিল লাগামহীন। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে ক্রমেই বাড়ছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসী ও সক্রিয় অবস্থানে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইস্যুটিকে পুনরায় বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়েছে।
বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন “জুলাই সনদ”, যা গণভোটে বিপুল সমর্থন পেয়েছে। এর বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ চিরতরে বন্ধ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শেষে তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
আপনার মতামত লিখুন :