ভোটের আগেই ভেঙে যেতে পারে জাতীয় নাগরিক পার্টি


Rastrerkotha প্রকাশের সময় : ২৪/১০/২০২৫, ৪:১০ অপরাহ্ণ /
ভোটের আগেই ভেঙে যেতে পারে জাতীয় নাগরিক পার্টি
67

এফ শাহজাহান, ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস:

অরক্ষিত স্বাধীনতায় পরাধীন বাংলাদেশকে মুক্ত করার অদম্য সাহসী শক্তিকে দুর্বল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারত। এজন্য রক্তঝরা চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের অবিনাশী চেতনাকে কবর দিতে নানা ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিছিয়েছে আধিপত্যবাদী শক্তি। সেই ষড়যন্ত্রের শেষ পরিনতিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগেই ভেঙ্গে যেতে পারে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।

সম্প্রতি দলটির এক অংশের আক্রমনাত্মক বক্তব্য বিবৃতি এবং আরেক অংশের নিরবতা-নিষ্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বড় ধরণের ফাটলের মধ্যে পড়েছেন তারা।

রাজনৈতিক মিত্রকে নিমিশেই শত্রু বানিয়ে ফেলা এনসিপির ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়েও জনমনে সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ সংশয়।

জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টিকে ভাঙ্গার ভারতীয় ষড়যন্ত্রের শেষ দৃশ্যে এখন মঞ্চস্থ হচ্ছে। ক্লাইমেক্সে ভরপুর এই নাটকের পরবর্তী দৃশ্যে অপেক্ষা করছে এক করুন ট্রাজেডি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দ্রুত সেই করুন পরিনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে এনসিপি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সদ্য ভুমিষ্ঠ জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপ অল্প সময়ের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিল। শুরুতে ‘তৃতীয় শক্তির বিকল্প রাজনীতি গড়ার অঙ্গীকার করলেও, দলটি এখন অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ফ্যা.সিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের জাতিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের অঙ্গিকার করেছিল দলটি।

বিএনপি এবং জামায়াতের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনী জোটকে ঘিরে এনসিপির ভেতর তীব্র মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এনসিপির আভ্যন্তরীণ বিরোধ এতোটাই প্রবল যে দলটি এখন ভাঙনের কবলে পড়তে যাচ্ছে।

শুরুতে এনসিপির লক্ষ্য ছিল দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে সমীকরণ সৃষ্টি করা, যা পুরনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি সমান্তরাল গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। তবে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতীয় ষড়যন্ত্রের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে দলটি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচনী জোট কৌশল নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রথমে জনতার বিকল্প নাগরিক রাজনীতি গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তরুণ নেতৃত্ব, স্বচ্ছ রাজনীতি, এবং প্রথাগত দলীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দলটি শুরুতে মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজে কিছুটা সাড়া জাগিয়েছিল।

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই দলের মধ্যেই দেখা দিয়েছে কৌশলগত দ্বন্দ্ব-কলহ। একপক্ষ চায় জুলাই চেতনা বিরোধী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমঝোতা। অপর পক্ষ ঝুঁকছে জুলাই চেতনাধারী প্রবল ভারতবিরাধী নতুন বাংলাদেশপন্থী ধারার দিকে। এই মতপার্থক্য শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং দলের আদর্শ ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকার প্রশ্নকেও সামনে এনেছে।

দলটির সভাপতি নাহিদ ইসলাম বিএনপি-ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দলের একটা বড় অংশ জুলাই বিপ্লবের চেতনা বিরোধীদের সঙ্গে মিশে যেতে চাচ্ছে। এরা এনসিপিকে দ্বিধাবিভক্ত করার মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবে গড়ে ওঠা ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসন বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করতে চায়। এই ষড়যন্ত্রের ফলে এনসিপির একটা বড় অংশ বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট করতে চায়।

অপরদিকে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সহ অন্যানরা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না। তারা এখনি এনসিপিকে কোন নির্বাচনী জোটে ভেড়াতে চান না। দলটির এই অংশ জুলাইয়ের বিপ্লবী চেতনাকে ধারণ করে নতুন বাংলাদেশ নিবির্মানের অংশ হতে চায়। এরা এনসিপিকে টিকিয়ে রেখেই ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং ভারতীয় আগ্রাসন মোকাবেলায় শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য গড়তে চায়।

নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী জোট করার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য ততই জোরালো হচ্ছে। এক অংশ বিএনপির সঙ্গে নির্বাটনী জোট করার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে আর অন্যপক্ষ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোট করা পক্ষে যাচ্ছে। এরফলে দ্রুত ভাঙ্গনের দিকে ধাবিত হচ্ছে এনসিপি।

তারা কি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে যাবে, নাকি বড় কোনো জোটে যোগ দেবে? এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ।

দলের মধ্যকার দুটি মূল গোষ্ঠী এখন দৃশ্যত চিহ্নিত হয়ে পড়েছে। এদের এক অংশ মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ বিরোধী সবচেয়ে কার্যকর মঞ্চ হলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট।

এই অংশের মতে, এনসিপি যদি রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায়, তবে বিএনপির ছাতার নিচে থেকে নিজেদের অবস্থান মজবুত করা উচিত। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি জোট করলে বিএনপি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে।

অপর পক্ষের মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অপ্রত্যাশিত ও অস্থির। সেখানে এনসিপির মতো নতুন দলকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। তার চেয়ে বরং জামায়াতের তৃণমূল ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা এনসিপিকে গ্রামীণ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করাের সুযোগ পাবে। তাদের দৃষ্টিতে, জামায়াতের ভোট ব্যাংক ও সংগঠিত কাঠামো এনসিপির দ্রুত প্রসারের হাতিয়ারও হতে পারে।

এনসিপির ভেতরে এই দুই ভিন্ন মতবাদের সংঘাতে দলের নেতৃত্বকেন্দ্রিক বিভাজন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বিভাজন কেবল দলের অস্তিত্বকেই প্রভাবিত করছে না, বরং বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির সমীকরণকেও পুন:রূপান্তরিত করছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিকে থাকা কঠিন। বড় দুটি দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর ভোট ব্যাংকের মধ্যে জায়গা করে নেওয়াও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির জন্য কৌশলগত ঐক্য জরুরি ছিল। কিন্তু এখন তাদের মধ্যে মতবিরোধের ফলে তৃণমূল কর্মীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের বিরুদ্ধ প্রচারণা চলছে। কয়েকটি জেলা শাখা আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দিয়েছে। কিছু তরুণ নেতা পদত্যাগের হুমকিও দিয়েছেন। ফলে দলটির ভেতরে সাংগঠনিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

এভাবে যদি বিভাজন বাড়তে থাকে, তাহলে এনসিপি জনমনে তাদের ‘নাগরিক বিকল্প’ ভাবমূর্তি হারাবে। যার কারণে আসন্ন নির্বাচনে দলটি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হতে পারে। ফলে, ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে এনসিপি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় সূচনা করেছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, জোটনীতি নিয়ে বিভ্রান্তি, এবং নেতৃত্বকেন্দ্রিক সংঘাত এখন সেই সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

দলটি যদি এখনই কৌশলগত সংহতি গড়ে না তোলে, তবে তাদের দুই ভাগে বিভক্ত হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। আর একবার বিভক্ত হয়ে পড়লে , বাংলাদেশের জটিল দ্বিদলীয় রাজনীতির ভেতর থেকে পুনরায় আত্মপ্রকাশের সুযোগ পাওয়া এনসিপির জন্য অসম্ভব হয়ে উঠবে।